দেশে এখন ফল চাষ হয় অন্তত ৭৮ প্রজাতির। দেশে মোট উৎপাদিত ফলের প্রায় অর্ধেক দখল করে আছে আম, কলা ও কাঁঠাল। গত কয়েক বছরে তরমুজ, পেঁপে, পেয়ারা, লিচু, আনারস, বরই ও ড্রাগন ফলের উৎপাদন বাড়লেও তা এই তিন ফলকে ছাড়াতে পারেনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখায় যায়, আম, তরমুজসহ ওপরের ১০ ফলের হিস্যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৫ শতাংশ। দেশের ফল আবাদি এলাকার ৭৯ শতাংশ জুড়ে এ দশ প্রজাতির ফলের চাষ হয়।
কলা
দেশে এখন সারা বছরের উৎপাদিত ফলের ৫৪ শতাংশই আসে মৌসুমের চার মাসে (মে-আগস্ট)। বাকি আট মাসে (সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল) পাওয়া যায় মাত্র ৪৬ শতাংশ ফল।
ভৌগোলিক কারণেও দেশে অনেক ফলের উৎপাদন বাড়ছে না। কাছাকাছি সময়ে দেশে একবারে প্রচুর ফল বাজারে আসছে। তখন অন্য ফল খাওয়ার আগ্রহ কম থাকছে। অপচয় হচ্ছে বেশি। এছাড়া বিদেশি ফলের একটি বড় বাজার রয়েছে, যা দেশি ফলের চেয়ে দাম বেশি হলেও ‘অভিজাত ফল’ হিসেবে অনেকে গ্রহণ করছেন।-ড. মো. মসিউর রহমান
তথ্য বলছে, দেশে এখন বছরে ১ কোটি ৫১ লাখ টন ফল উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে আম ২৭ লাখ টন, কলা ২২ লাখ টন ও কাঁঠাল উৎপাদন হচ্ছে ১৮ লাখ টন। তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টন। পেঁপে ও পেয়ারা উৎপাদন হচ্ছে ৬ লাখ টন করে। এছাড়া দুই থেকে তিন লাখ টন করে আনারস, লিচু ও বরই উৎপাদন হয় দেশে। ড্রাগনের উৎপাদনও একলাখ টনের কাছাকাছি।
অপ্রচলিত ফলের বাণিজ্যিক মূল্য কম
দেশে উৎপাদনের ক্ষেত্রে মাত্র কয়েকটি ফল কেন বেশি প্রধান্য পাচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মসিউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে বহু অপ্রচলিত ফলের বাণিজ্যিক মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে চাষিরা এসব ফল উৎপাদনে আগ্রহী নয়। এছাড়াও দেশে অপ্রচলিত ফলের জাত উন্নয়নে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, বাণিজ্যিক চাষাবাদ কম। কিছু ফলের চাহিদাও সীমাবদ্ধ, মানুষ খুব বেশি দাম দিয়ে এগুলো খেতে চায় না।’
আরও পড়ুন
কাঁঠালের বাম্পার ফলন, তবুও হাসি নেই চাষির মুখে
ভৌগোলিক কারণেও দেশে অনেক ফলের উৎপাদন বাড়ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাছাকাছি সময়ে দেশে একবারে প্রচুর ফল বাজারে আসছে। তখন অন্য ফল খাওয়ার আগ্রহ কম থাকছে। অপচয় হচ্ছে বেশি। এছাড়া বিদেশি ফলের একটি বড় বাজার রয়েছে, যা দেশি ফলের চেয়ে দাম বেশি হলেও ‘অভিজাত ফল’ হিসেবে অনেকে গ্রহণ করছেন।’
এ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, ‘সারাবছর যেন বিভিন্ন দেশি ফল পাওয়া যায় এ লক্ষ্যে সব ধরনের ফল চাষের বড় পরিকল্পনা দরকার। জাত উন্নয়ন ও আরও গবেষণা প্রয়োজন।’
বেড়েছে আম-কলার উৎপাদন
তথ্য বলছে, উৎপাদনে শীর্ষে থাকা তিন ফলের মধ্যে আম ও কলার উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এখন সবচেয়ে বেশি ও বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে আম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর (২০২৬) দুই লাখ সাত হাজার হেক্টর জমি থেকে ২৭ লাখ ৯৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর দুই লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হয়েছিল ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন। বর্তমানে দেশে ১৪টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আমের ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
অন্য ফলের উৎপাদন বাড়লেও কাঁঠাল খাওয়ার বিষয়ে মানুষের অনীহা রয়েছে। যে কারণে আম, লিচুর মতো বাণিজ্যিক চাষাবাদ হয়নি এ ফলের। এ কারণে উৎপাদন কমছে।-কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. মইনুল হক
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সব ফলের মধ্যে আমের চাহিদা ও বাণিজ্যিক মূল্য বেশি। এখন আম রপ্তানিও ভালো হচ্ছে। যে কারণে চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে।’
আরও পড়ুন
১৩ হাজার কোটি টাকার আমের বাজারে রপ্তানি তলানিতে
গত এক দশকে কলার উৎপাদন ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ টনে। তবে একই সময়ে কাঁঠাল খাওয়ার বিষয়ে মানুষের অনীহা রয়েছে। যে কারণে এখনো বাণিজ্যিক চাষাবাদ হয়নি এ ফলের।
কমেছে কাঁঠাল ও নারিকেলের উৎপাদন
এক যুগে প্রধান ফলের মধ্যে কাঁঠাল ও নারিকেলের উৎপাদন কমেছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩২ লাখ ১২ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদন হতো, যা সর্বোচ্চ ছিল। এখন উৎপাদন কমে ১৮ লাখ ৩০ হাজার টনে নেমেছে। এক যুগে কাঁঠাল উৎপাদনের জমি ৮২ হাজার ৬৯১ হেক্টর থেকে কমে এসেছে ৫৮ হাজার ৭০০ হেক্টরে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদিও ভূ-প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় বাংলাদেশে প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদিত হয়, তবে কাঁঠাল ও কাঁঠালজাত পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানিতে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে। কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার না বাড়ায় এর দাম থাকছে না, যে কারণে বাণিজ্যিক উৎপাদন নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. মইনুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘অন্য ফলের উৎপাদন বাড়লেও কাঁঠাল খাওয়ার বিষয়ে মানুষের অনীহা রয়েছে। যে কারণে আম, লিচুর মতো বাণিজ্যিক চাষাবাদ হয়নি এ ফলের। এ কারণে উৎপাদন কমছে।’
আবারও বিভিন্ন ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও অপ্রচলিত ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে নতুন একটি প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।-বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের সবশেষ প্রকল্প পরিচালক আব্দুল হালিম
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে তরমুজ, লিচু, বরই, পেঁপে, পেয়ারা ও আনারসের উৎপাদন ক্রমেই বেড়েছে।
এছাড়া প্রধান প্রধান দেশি ফল ছাড়াও দেশে ড্রাগন, স্ট্রবেরি ও মাল্টাজাতীয় বিদেশি ফলের উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। এসব ফল এখন বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফলে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন
প্রতিদিন কোটি টাকার দিনাজপুরের কলা যাচ্ছে সারাদেশে
ফলের উৎপাদন বাড়াতে নতুন প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পটি দেশে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ওই প্রকল্প শেষ হয়েছে গত বছর।
তবে ওই প্রকল্পের আদলে আরেকটি নতুন প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে বলে জানিয়েছেন বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের সবশেষ প্রকল্প পরিচালক আব্দুল হালিম। তিনি বলেন, ‘আবারও বিভিন্ন ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও অপ্রচলিত ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে নতুন একটি প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ফল চাষ, ব্যবসা ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশে প্রচুর তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এছাড়া ফলের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পরিধি বাড়ছে। প্রক্রিয়াকরণেও ঝোঁক বাড়ছে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের। এ খাতে উৎপাদন বাড়াতে ও উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে আরও কিছু নীতি-সহায়তা দিতে সরকার কাজ করছে।’
এনএইচ/এএসএ/ এমএফএ








