ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বসেরা কাতারে। দেশে উৎপাদন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। তবে প্রক্রিয়াজাতকরণ বা ফ্রুট-প্রসেসিংয়ে গতি নেই।
গত কয়েক বছর প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে এ হার মোট উৎপাদিত ফলের মাত্র দুই শতাংশেরও কম। বাংলাদেশের মতো শীর্ষ অন্য উৎপাদনকারী দেশ অর্ধেকের বেশি ফল প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্যপণ্য তৈরি করছে। প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প শক্তিশালী না হওয়ায় প্রতি বছর নষ্ট হয় বিপুল পরিমাণ ফল।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, মৌসুমি ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে। এমনকি মোট ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের ৯তম। আম, কাঁঠাল ও পেয়ারার মতো নির্দিষ্ট মৌসুমি ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকার সামনের সারিতে।
আরও পড়ুন
ফল রপ্তানিতে বড় বাধা বিমান ভাড়া, প্রয়োজন অবকাঠামো উন্নয়ন
একই সঙ্গে উদ্বেগের তথ্য হলো, বাংলাদেশে উদ্বৃত্ত ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের হার হতাশাজনক। এ দেশে প্রক্রিয়াকরণের অভাবে বছরে প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ফল নষ্ট হয়। যার আর্থিক মূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি বলে তথ্য রয়েছে বিভিন্ন গবেষণায়।
বৈশ্বিক প্রক্রিয়াকরণের অবস্থা
বর্তমানে বৈশ্বিক ফল উৎপাদনকারী দেশগুলোর প্রক্রিয়াকরণের হার ৪৫ শতাংশ বলে তথ্য দিচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস। অর্থাৎ, একটি দেশ যে পরিমাণে ফল উৎপাদন করে এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রক্রিয়াকরণ করে নানা ধরনের খাবার তৈরি করছে।

আরও কিছু বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ প্রক্রিয়াকরণের হার উন্নত বিশ্বে আরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের কিছু দেশ তাদের উৎপাদিত ফলের ৭০ শতাংশেরও বেশি প্রক্রিয়াকরণ করে।
বিশ্বের শীর্ষ ফল উৎপাদনকারী দেশ চীন। দেশটি উৎপাদিত ফলের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করছে। কারণ, তাদের উৎপাদিত ফলের একটি বড় অংশ তাজা ফল হিসেবে অন্য দেশে রপ্তানি হয়। উৎপাদনে শীর্ষ কাতারে থাকা আরও দুই দেশে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় প্রক্রিয়াকরণের হার ৮০ শতাংশের ওপরে।
আরও পড়ুন
আঠার ফাঁদে আটকা কাঁঠালের সম্ভাবনা
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো প্রক্রিয়াকরণে অত্যন্ত পিছিয়ে। বিশ্বে মোট ফল উৎপাদনে চীনের পর ভারত। দেশটি প্রক্রিয়াজাত করছে মাত্র পাঁচ শতাংশ। যদিও তারা তাজা ফল রপ্তানি করে। বাংলাদেশের ফল রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পও নানা সীমাবদ্ধতায় ধুঁকছে।
প্রক্রিয়াজাত ফলপণ্যের বৈশ্বিক বাজার
ফরচুন বিজনেসের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ বাজারের আকার ছিল ১০ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ফলের হিস্যা প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০৩৪ সাল পর্যন্ত ন্যূনতম ৮ শতাংশ হারে বেড়ে এই বাজার ২০২৬ সালের ১১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ২১ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, প্রক্রিয়াজাত ফল ও এ জাতীয় পণ্যের বাজার হবে সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের অবস্থা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, এ দেশে গত বছর ১ কোটি ৫১ লাখ টন ফল উৎপাদন হয়েছে। অর্থাৎ, প্রক্রিয়াকরণে ২ শতাংশ হিস্যা ধরা হলেও ওই বছর ফলজাত পণ্য হয়েছে মাত্র তিন লাখ টন ফলের।
তথ্য বলছে, প্রক্রিয়াজাত শুকনো খাবার রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই নগণ্য, ২৯২তম। বাংলাদেশে বর্তমানে প্যাকেটজাত খাবারের বাজার ৪৮০ কোটি মার্কিন ডলারের, যার মধ্যে ফল ছাড়াও অন্য কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রয়েছে।
বৈশ্বিক আরেক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ ১৩টি দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য পাঠিয়েছে। কিন্তু বিপণন শেয়ার মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে কাঁঠাল
নতুন নতুন গন্তব্য সৃষ্টি ও পণ্য বহুমুখীকরণে দুর্বলতার কারণে রপ্তানি বাজারটি বড় হচ্ছে না বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে নতুন নতুন গন্তব্য ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের পণ্যের এখনো মূল ক্রেতা বাংলাদেশি প্রবাসীরা, এথনিক মার্কেটে। আমরা গতানুগতিক পণ্যের বাইরে বিশ্বের উন্নত দেশের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে পারছি না। ফলে বৈশ্বিক বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছি না।’
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিশ্ব যখন অ্যাগ্রো-প্রসেসিংয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, বাজার বড় হচ্ছে, তখন আমরা মাত্র ২ শতাংশের নিচে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে আটকে আছি। এটি হতাশাজনক।’
আরও পড়ুন
ফল প্রক্রিয়াজাতে প্রশিক্ষণ আছে, নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি সহায়তা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই গন্তব্য ও পণ্য বহুমুখীকরণে দুর্বলতার পাশাপাশি অপ্রতুল সরকারি নীতি সহায়তা, প্রক্রিয়াকরণের জন্য বাণিজ্যিক ফলের প্রজাতির সীমাবদ্ধতা, উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাপ-গুড এগ্রিকালচার প্রাকটিসেস না মানা, বড় বিনিয়োগ স্বল্পতা, উৎপাদনশীলতা জ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাব এবং কার্যকরি গবেষণা না থাকার কারণে দেশে ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গতি পায়নি।
প্রক্রিয়াজাতকারীদের অবস্থা কী
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য বলছে, দেশে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় এক হাজারের বেশি। তার মধ্যে ৯০ শতাংশই অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র। বাকি ১০ শতাংশ মাঝারি ও বড়। বড় প্রতিষ্ঠান ২০টি।
![]()
বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য পণ্যের সঙ্গে ফল প্রক্রিয়াজাত করে এবং পণ্য রপ্তানি করে। আর ৮০ শতাংশ পণ্যের রপ্তানি হয় ছয় থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। দেশের বড় শিল্পগ্রুপের মধ্যে প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার, আকিজ, বসুন্ধরা, বম্বে সুইটস, সেজান গ্রুপসহ কিছু প্রতিষ্ঠান এ খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে।
হাজারখানেক অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের গতানুগতিক ফল প্রক্রিয়াকরণ এবং সবাই একই ধরনের পণ্য উৎপাদন করছে। যেমন, আচার, আমসত্ত্ব, চাটনি, কাসুন্দি, জ্যাম-জেলির মতো পণ্য সাবই উৎপাদন করছে। তারা আম, আনারস, পেয়ারা, কাঁঠাল বরইয়ের মতো মৌসুমি প্রধান ফলগুলো প্রক্রিয়াকরণে সীমাবদ্ধ।
আরও পড়ুন
ফল উৎপাদন-প্রবৃদ্ধিতে দৃষ্টান্ত গড়ছে বাংলাদেশ
বড় বড় শিল্পগ্রুপ প্রক্রিয়াজাত ফ্রোজেন ফুড, ড্রাই ফুড, ম্যাঙ্গো পাল্প এবং নানা ধরনের ফলের জুস উৎপাদন করছে। যা বিশ্বের ১৪৮টি দেশে রপ্তানি হয়। তবে তাদেরও রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশের গন্তব্য হাতেগোনা কয়েকটি দেশে। পণ্যের বৈচিত্র্য না থাকায় মোট রপ্তানির অর্ধেকই পাঁচ থেকে ছয় ধরনের পণ্য। নতুন নতুন গন্তব্য সৃষ্টি ও পণ্য বহুমুখীকরণে দুর্বলতার বড় বড় কোম্পানিগুলোরও রয়েছে।
উদ্যোক্তারা যা বলছেন
ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বড় প্রতিবন্ধকতা কী- এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমত, আমাদের ভালো ফলের জাত নেই। যেগুলো আছে তার অধিকাংশ প্রক্রিয়াকরণের উপযুক্ত নয়।’
এছাড়া জাত ও ধরন বুঝে কোন ফল কোথায়-কীভাবে ব্যবহার হবে, তার কোনো পরিকল্পনা নেই কারও। অর্থাৎ আম, কাঁঠালের কোন জাত তাজা খাওয়া হবে, কোনটি ফ্রোজেন খাবার হবে, কিংবা কোনটি শুকনো খাবার তৈরিতে ব্যবহার হবে, বা পাল্প হবে- সেটি কেউ জানে না বলে জানান ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যথাযথ প্রযুক্তি নেই। দেশি সহজলভ্য প্রযুক্তির জন্য কারও কোনো গবেষণাও নেই। প্রযুক্তিবিদ ও গবেষক একসঙ্গে কাজ করে না কখনো, তাদের কোনো সমন্বয় নেই।’
এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন যারা উৎপাদনকারী রয়েছেন, তাদের প্রতিপক্ষ ভাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা মাঝে মধ্যে কারখানা পরিদর্শনে এসে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ছাড়াও উদ্যোক্তাদের জরিমানা করেন।’
কাঁঠাল থেকে তৈরি খাবার
দেশে সবচেয়ে বেশি ফল প্রক্রিয়াকরণ করছে প্রাণ গ্রুপ। কিছুদিন আগে এক কর্মশলায় গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে অনেক ক্ষেত্রে এ দেশের খাদ্যপণ্য অনিরাপদ হচ্ছে, যেটা পণ্য প্রক্রিয়াজাতকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ। আবার অনিরাপদ ফসলের জন্য অনেক পণ্য দেশে থাকলেও আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে।
দেশে গ্যাপ (গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস) নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ফসল উৎপাদনের সময় ক্ষতিকারক ভারী ধাতু মিশে যাচ্ছে, যা প্রক্রিয়াকরণের সময় আলাদা করা যাচ্ছে না, যা আবার প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানিগুলোর সুনামও ক্ষুণ্ন করছে।
‘সংরক্ষণ ও সরবরাহ পর্যায়ে দুর্বলতা রয়েছে। দেশের অনেক খাদ্যপণ্য এসব পর্যায়ে নষ্ট হচ্ছে, অনিরাপদ হচ্ছে। অন্যদিকে দেশে খাদ্যমান পরীক্ষার জন্য ভালো টেস্টিং ল্যাব নেই। আমরা বারবার সরকারকে একটি বিশ্বমানের ল্যাব প্রতিষ্ঠার জন্য বলেছি। সেটি হয়নি,’ বলেন কামাল।
কামরুজ্জামান কামাল আরও বলেন, এ দেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে এবং পলিসিতে সমস্যা রয়েছে। খাদ্যপণ্যের একটি ব্যবসা শুরু করতে প্রায় ৪২ সংস্থার অনুমতি নিতে হয়। এরপর ব্যবসা পরিচালনে মাত্রাতিরিক্ত নবায়ন ফি, লাইসেন্স ফিসহ নানা ফি দিতে হয়, যা পাশের দেশ কিংবা প্রতিযোগী যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি। যে কারণে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকতে হয়।
আরও পড়ুন
লিচু নিয়ে দেশে নেই কোনো গবেষণা কেন্দ্র
বিএসপি ফুডের কর্ণধার অজিত কুমার দাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ফলগুলো মূলত গ্রীষ্মকালীন বা মৌসুমি। তিন-চার মাসের মধ্যে সব ফল প্রক্রিয়াজাত করে পাল্প বানিয়ে রাখতে হয়, যা বেশ ব্যয়বহুল। বছরব্যাপী ফলের অভাব এ শিল্পের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারে বাধা দেয়।’
এছাড়া এ শিল্প সরকারের সে ধরনের আকর্ষণীয় নীতি-সহায়তা কখনো ছিল না জানিয়ে বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বড় আকারের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট ও আধুনিক কমিউনিটি-ভিত্তিক হিমাগার স্থাপনের দরকার ছিল, যেটা হয়নি।’
নতুন উদ্যোক্তাদের আরও দুর্দশা
বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারায় যখন শিল্প প্রসারে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ছোট উদ্যোক্তারা আরও বেশি ধুঁকছেন। আম থেকে কয়েক ধরনের পণ্য বানিয়েছেন নওয়াবি ম্যাংগোর স্বত্বাধিকারী ইসমাইল খান শামীম।
তিনি তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে আমি যে প্রোডাক্টগুলো নিয়ে কাজ করছি, প্রতিটিই নিজস্ব গবেষণা করে বের করতে হয়েছে। দেশে অপ্রচলিত কোনো পণ্য নিয়ে কাজ করতে এক্সপার্টিস মেলে না। একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে আমি বহু বছর হিমশিম খেয়েছি।’

দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রপাতির অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ দেশে আধুনিক ড্রাইং, প্রসেসিং ও প্যাকেজিং মেশিনের সহজলভ্যতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের প্রযুক্তি কাঠামো একদম সীমিত। ফলে অনেক উদ্যোক্তাকে বিদেশি প্রযুক্তি অনুসরণ করে নিজস্বভাবে পণ্য উৎপাদনের পদ্ধতি তৈরি করতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে বিশ্বমানের পণ্য তৈরি সম্ভব নয়।’
বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্কের একজন কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছোট উদ্যোক্তাদের কখনো কখনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কিন্তু ভালো মানের যন্ত্রপাতির আবিষ্কার না থাকায় বিদেশ থেকে যন্ত্রগুলো আনতে হয়, যা বেশ ব্যয়বহুল। এরপর ব্যবসা লাভজনক থাকে না।’
নানা সীমাবদ্ধতার বিষয়ে একমত বিশেষজ্ঞরাও
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বলেছিলেন। একইভাবে দীর্ঘদিন ফল নিয়ে কাজ করা একজন সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী মাসুদ জাগো নিউজকে বলেন, বিশ্বে নতুন নতুন যেসব ফল প্রক্রিয়াকরণে প্রযুক্তি সেসব বাংলাদেশে আসেনি। এছাড়া প্রক্রিয়াকরণের আগে ফল সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা দেশে নেই।’
আরও পড়ুন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ / উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে ৩৬ বছরে ১৬ জাতের আম উদ্ভাবন
যে কারণে দেশে ভরা মৌসুমে যখন প্রচুর ফল উৎপাদন হয়, তখন কিছু প্রক্রিয়াকরণ হলেও বাকি প্রায় নয় মাস কোম্পানিগুলো কাঁচামাল সংরক্ষণ করতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফল প্রক্রিয়াকরণের জন্য মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের সংরক্ষণাগার দরকার জানিয়ে বলেন, ‘সেটা দেশে নেই। ফলে ভরা মৌসুমের উদ্বৃত্ত ফল প্রক্রিয়াকরণ হয় না, অপচয় হয়।’
তিনি বলেন, ফল, ফল প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি নিয়ে প্রচুর গবেষণা দরকার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের কৃষি বাজেটে মাত্র দশমিক ২৬ শতাংশ বরাদ্দ গবেষণায়। যেখানে ফল উৎপাদনকারী বড় বড় দেশ এ খাতে কৃষি বাজেটের অন্তত ২ শতাংশের বেশি বরাদ্দ রাখে।
গবেষণা ও প্রযুক্তি
দেশে প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বারি কাজ করছে। জানা যায়, এ পর্যন্ত ২৪ ধরনের বিভিন্ন ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বৈশ্বিক বিবেচনায় সেটি পর্যাপ্ত নয়।
এছাড়াও যেসব প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে সেটাও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে একদম সীমিত পরিসরে বিস্তৃতি পেয়েছে। এর মধ্যে কাঁঠাল, কলা ও আলুর ভ্যাকুয়াম ফ্রাইড চিপস এখন জনপ্রিয়। তবে ওই প্রযুক্তি হাতেগোনা কিছু উদ্যোক্তা সফলভাবে প্রস্তুত করে বিক্রি করছে।
দেশে মাত্র ১২ শতাংশ উদ্যোক্তা আইএসও-ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও এইচএসিসিপি-হ্যাজার্ড অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কন্ট্রোল পয়েন্টস মান নিয়ন্ত্রণ করছে, যা অতি অপ্রতুল। ফলে ওইসব উদ্ভাবন রপ্তানি বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুছ ছালাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘যেসব প্রযুক্তি ও গবেষণা হচ্ছে, সেটা বাস্তবায়নে এখন কাজ হচ্ছে। রপ্তানিযোগ্য পণ্য প্রস্তুতের গবেষণা জোরদার করা হচ্ছে।’
এ সরকারের এন্টারপ্রেনারশিপ সাপোর্ট ফান্ডের (ইএসএফ) মাধ্যমে ২ শতাংশ সুদহারে ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি শুরু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য সহায়ক গবেষণারও উদ্যোগ রয়েছে।’
এনএইচ/এএসএ








