যানজটে নাকাল রাজধানী শহরের রাস্তাঘাট ভালো থাকলে নগরবাসী কিছুটা স্বস্তিতে চলাচল করতে পারেন। কিন্তু ঢাকার মানুষের কপালে সেই স্বস্তি যেন বেশি দিন সয় না। এক সংস্থার কাজ শেষ হতে না হতেই আরেক সংস্থা রাস্তা খুঁড়তে নেমে পড়ে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের জন্য ঢাকা ওয়াসা এবার ধাপে ধাপে ৫০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক কাটতে যাচ্ছে। ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকার এই ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প’ ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে। একটি আধুনিক পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই; কিন্তু যে পদ্ধতিতে এবং যেভাবে সমন্বয়হীনভাবে এই কাজ শুরু হয়েছে, তা নগরবাসীকে চরম ও দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির মুখে ফেলবে, তা বলা বাহুল্য।
সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয় হলো, ঢাকা ওয়াসা মাত্র কিছুদিন আগেই (২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত) এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকার পানির পাইপলাইন বদলানোর জন্য বছরের পর বছর ধরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করেছে। পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন—দুটিই মাটির নিচের অবকাঠামোর কাজ। নগর-পরিকল্পনাবিদদের বক্তব্য, ওয়াসা যদি দূরদর্শিতা ও সঠিক সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোত, তবে একই সড়ক একাধিকবার কাটার প্রয়োজন হতো না। একবার পানির লাইনের জন্য রাস্তা কাটা, সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আবার মলমূত্র বা বর্জ্য লাইনের জন্য একই রাস্তা খুঁড়ে ফেলা কোনো সভ্য ও আধুনিক নগরে কল্পনাও করা যায় না। এটি কেবল সংশ্লিষ্ট সংস্থার চরম অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা ও জবাবদিহির অভাবকেই স্পষ্ট করে।
প্রকল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও এই সমন্বয়হীনতার পক্ষে খোঁড়া যুক্তি ও আমলাতান্ত্রিক অজুহাত দেখা গেছে। দাতা সংস্থাগুলোর ভিন্ন নীতি বা প্রশাসনিক জটিলতার কথা বলে নাগরিকদের ওপর এই দুর্ভোগ চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার ওপর বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। এই কর্দমাক্ত সময়ে ব্যস্ত সড়কগুলো টিন দিয়ে মাসের পর মাস ঘিরে রাখা এবং রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখার কারণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। নিউমার্কেট বা খিলগাঁওয়ের মতো এলাকায় কাজের কোনো সময়সীমা বা সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড না থাকা, খনন করা মাটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে না সরানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা ‘ঢাকা মহানগরীর সড়ক খনন নীতিমালা’র প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
উন্নয়ন কখনোই নাগরিকদের জীবনকে জিম্মি করে কিংবা জনভোগান্তিকে চিরস্থায়ী রূপ দিয়ে হতে পারে না। এই বারবার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে কেবল জনগণের করের টাকার অপচয় হচ্ছে না, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সড়কের স্থায়িত্বও ধ্বংস হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে কেবল কাগজে-কলমে সমঝোতা স্মারক সই হলেই হবে না, বাস্তব ক্ষেত্রে এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা আশা করি, ওয়াসা বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এবং সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করবে, যাতে একই রাস্তা বারবার কাটতে না হয়। একই সঙ্গে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং বর্ষার দুর্ভোগ মাথায় রেখে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খনন করা মাটি অপসারণের শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর এই খামখেয়ালি ও সমন্বয়হীনতার দায় কেন বারবার সাধারণ নগরবাসী নিজের পকেট ও দুর্ভোগ দিয়ে শোধ করবে—সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময় এসেছে।





